উত্তরের হিমালয়কন্যা পঞ্চগড়ের রাজনৈতিক আকাশে এখন এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম মোছাঃ সুলতানা রাজিয়া। সাধারণ মানুষের কাছে যিনি কেবল একজন জনপ্রতিনিধি নন, বরং বিপদের বন্ধু ও আস্থার এক শেষ আশ্রয়স্থল। তেঁতুলিয়ার ময়নাগুড়ি গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে ১৯৭৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া এই মহীয়সী নারী আজ জেলাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। মৃত সবার উদ্দিন প্রধান ও মৃত মনোয়ারা বেগমের কন্যা সুলতানা রাজিয়া ১৯৯৪ সালে রাজশাহী বোর্ড থেকে এসএসসি পাসের পর থেকেই নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন মানুষের সেবায়। তাঁর এই দীর্ঘ পথচলা মোটেও মসৃণ ছিল না, বরং ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর এক সংগ্রামের ইতিহাস।
সুলতানা রাজিয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক যাত্রার শুরুটা ছিল অত্যন্ত তৃণমূল থেকে। ১৯৯৬ সালে বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষকতা এবং পরবর্তীতে ১৯৯৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত পুষ্টি প্রকল্পের সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করে তিনি তেঁতুলিয়ার প্রতিটি ঘরে ‘পুষ্টি আপা’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। এই সময়কালটিই ছিল তাঁর জনসেবার মূল ভিত্তি। মানুষের এই ভালোবাসাই তাঁকে ২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো তেঁতুলিয়া উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত করে। এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। টানা চারবার—২০১৪, ২০১৯ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালেও বিপুল জনসমর্থন নিয়ে তিনি একই পদে পুনর্নির্বাচিত হয়ে এক অনন্য রেকর্ড গড়েন। এই দীর্ঘ ১৫ বছরের জনপ্রতিনিধিত্বের নেপথ্যে ছিল সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর অবিচল আস্থা আর গভীর মমত্ববোধ।
কেবল জনপ্রতিনিধি হিসেবেই নয়, রাজপথের লড়াকু সৈনিক হিসেবেও সুলতানা রাজিয়া এক অদম্য নাম। বর্তমানে তিনি জাতীয়তাবাদী মহিলা দল, পঞ্চগড় জেলা শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং জেলা বিএনপির সদস্য হিসেবে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করছেন। এর আগে তিনি উপজেলা বিএনপি ও মহিলা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দলকে সুসংগঠিত করেছেন। ২০১৪ সালের কেন্দ্রীয় আন্দোলনের সময় থেকে শুরু করে ২০১৮ সালের নির্বাচন পর্যন্ত তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চরম শিকার হয়েছেন। অসংখ্য মিথ্যা মামলা, পুলিশের নিয়মিত অভিযান আর ফেরারি জীবনের কষ্ট তাঁকে দমাতে পারেনি। এমনকি তাঁর পরিবারের ওপর একাধিকবার হামলা হলেও তিনি শহীদ জিয়ার আদর্শ থেকে এক চুলও বিচ্যুত হননি। নিজের এলাকায় দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় ২০২৪ সালের ইউনিয়ন পর্যায়ের নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবেও তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে সুলতানা রাজিয়া প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘অনন্যা মহিলা উন্নয়ন সংস্থা’। নারীদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তিনি সবসময় অগ্রগামী। তাঁর এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৯ সালে উপজেলা পর্যায়ে এবং ২০১৫ সালে জেলা পর্যায়ে তিনি শ্রেষ্ঠ ‘জয়িতা’ হিসেবে সম্মাননা লাভ করেন। তেঁতুলিয়ার দুর্গম চরাঞ্চল থেকে শুরু করে শহরের অলিগলি—সবখানেই তাঁর পদচারণা। গভীর রাতে যখন কেউ অসুস্থ হয় কিংবা কোনো নারী নির্যাতনের শিকার হন, সুলতানা রাজিয়া নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে ছুটে যান সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। সাধারণ মানুষের এই ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’ এখন স্বপ্ন দেখছেন বৃহত্তর পরিসরে সেবা করার।
ব্যারিস্টার মুহাম্মদ নওশাদ জমিরের মতো জাতীয় স্তরের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের দিকনির্দেশনায় সুলতানা রাজিয়া আজ নিজেকে এক অভিজ্ঞ ও দক্ষ নেতৃত্বে পরিণত করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেলে তিনি পঞ্চগড় জেলাকে মাদকমুক্ত ও শিক্ষিত একটি মডেল জনপদ হিসেবে গড়ে তুলতে পারবেন। তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও মনে করেন, সুলতানা রাজিয়ার মতো ত্যাগী ও লড়াকু নেত্রীকে সংসদে পাঠালে কেবল নারী সমাজই নয়, বরং গোটা জেলার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। অবহেলিত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে তিনি পঞ্চগড়ের নারীদের অধিকার আদায়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবেন—এমনটাই এখন জেলাবাসীর প্রত্যাশা।