পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের যুগিভিটা এলাকায় মফিজার রহমান কলেজের প্রিন্সিপাল মোঃ নূরুল্লাহর বাড়িতে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর ও দুর্ধর্ষ ডাকাতির রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। অভাবের তাড়না আর জমি বর্গা না পাওয়ার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে খোদ প্রতিবেশী আলমের লালিত হীন পরিকল্পনায় এই পৈশাচিক ঘটনাটি ঘটে। আজ শুক্রবার দুপুরে পঞ্চগড় জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেন।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখ দিবাগত মধ্যরাতে একদল সশস্ত্র ডাকাত প্রিন্সিপাল নূরুল্লাহর বাড়িতে হানা দেয়। তারা বাড়ির গ্রিলবিহীন জানালা সাবল দিয়ে ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে পরিবারের সদস্যদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ফেলে। ডাকাতরা নূরুল্লাহর স্ত্রী, সন্তান ও শাশুড়ির গলায় ধারালো ছুরি ও চাকু ধরে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আলমারিতে থাকা প্রায় ৮ ভরি স্বর্ণালঙ্কার (যার বাজারমূল্য প্রায় ২০ লক্ষ টাকা), নগদ ২ লক্ষ ২০ হাজার টাকা এবং মোবাইল ফোন লুট করে নিয়ে যায়। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবার থানায় অভিযোগ দায়ের করলে পুলিশ সুপারের নির্দেশে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও পুলিশের একটি চৌকস দল ছায়া তদন্ত শুরু করে।
তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিক কলাকৌশল ব্যবহার করে গত ৪ মার্চ দিবাগত রাতে পঞ্চগড়ের গাড়াতি ছিটমহল ও পুকুরীডাঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ এই চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। ধৃত আসামিরা হলেন—একই ইউনিয়নের মোঃ মজিবর রহমান (৩৫), মোঃ রমজান আলী (৩০), মোঃ সাদ্দাম হোসেন (৩০), মোঃ আশিক (১৯) এবং মোঃ জুবায়ের ওরফে জিদান (১৯)। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি স্মার্টফোন, সিম কার্ড এবং ডাকাতিতে ব্যবহৃত সাবল, চাকু ও বড় ছোরা উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে গ্রেপ্তারকৃতদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৫ মার্চ রাত আনুমানিক ১টা ৩৫ মিনিটে যুগিভিটার জিয়াবাড়ী এলাকা থেকে এই ঘটনার মূল হোতা ও পরিকল্পনাকারী প্রতিবেশী মোঃ আলমকে (৩৭) গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের তদন্তে উঠে আসা এক মর্মান্তিক ও অমানবিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়। মূল পরিকল্পনাকারী আলম অত্যন্ত দরিদ্র হওয়ায় নূরুল্লাহ সাহেবের কাছে এক বিঘা জমি বর্গা চাষের জন্য চেয়েছিলেন। কিন্তু জমি না পেয়ে মনে মনে ক্ষোভ পুষে রাখেন তিনি। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি নূরুল্লাহ সাহেব হজে যাওয়ার সুযোগটিকেই কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করেন আলম। তিনি তার সহযোগী কামরুলের সাথে পরিকল্পনাটি শেয়ার করলে কামরুল তাকে অভয় দেয় এবং সাদ্দাম, মনির ও জুবায়েরের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।
ঘটনার রাতে ডাকাত সদস্যরা সাদ্দামের বাড়ির কাছে একটি গাছের নিচে একত্রিত হয়ে চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়। রাত দেড়টার দিকে তারা নূরুল্লাহর বাড়িতে প্রবেশ করে। প্রথম চারটি ঘরে কিছু না পেয়ে পঞ্চম ঘরে তারা নূরুল্লাহর স্ত্রী ও সন্তানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আলম নিজেকে আড়াল করতে মুখে মুখোশ পরে থাকলেও তার সহযোগীরা পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নেয়। এই সময় নূরুল্লাহর ছোট সন্তান ভয়ে কান্নাকাটি শুরু করলে ডাকাতরা তাকে কেক ও পানি খাইয়ে শান্ত করার এক বিচিত্র ও নাটকীয় আচরণও প্রদর্শন করে। ডাকাতি শেষে তারা সংগৃহীত নগদ ৩০ হাজার টাকা নিজেদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে নেয় এবং স্বর্ণালঙ্কার বিক্রির জন্য কামরুল ও মনিরের কাছে হস্তান্তর করে।
পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তারকৃত আলম ইতোমধ্যে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে নিজের অপরাধ কবুল করেছেন। বর্তমানে সাদ্দাম, জুবায়ের, রমজান, মজিবর ও আশিক দুই দিনের পুলিশি রিমান্ডে রয়েছেন এবং আলমকে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। এই চক্রটি একটি আন্তঃজেলা ডাকাত দল, যারা ইতোপূর্বে জগদলসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ডাকাতির ঘটনা ঘটিয়েছে। ঘটনায় জড়িত পলাতক আসামি কামরুল ও মনিরকে গ্রেপ্তার এবং বাকি লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধ দমনে জেলা পুলিশ সর্বদা সচেষ্ট থাকবে বলে সংবাদ সম্মেলনে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।