প্রকৃতির রুদ্ররোষে মুহূর্তেই লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জের সাজানো সংসারগুলো। গত ২৭ মার্চ শুক্রবার রাতের সেই কালবৈশাখী ঝড় আর শিলাবৃষ্টির তাণ্ডব কেড়ে নিয়েছিল বহু মানুষের মাথার ওপরের শেষ আশ্রয়টুকু। ঝড়ে ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়ে খোলা আকাশের নিচে দিনাতিপাত করা সেই অসহায় পরিবারগুলোর পাশে এবার এসে দাঁড়িয়েছেন সুদূর তুরস্কের এক নাগরিক এবং স্থানীয় ছাত্রদল নেতা। বিপন্ন মানুষের কান্নার শব্দ সীমান্ত পেরিয়ে পৌঁছে গেছে এক ভিনদেশী হৃদয়ে, যা আজ দেবীগঞ্জের মাটিতে এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর করুণ চিত্র সংবলিত একটি ভিডিওর মাধ্যমে। ‘সত্যের সন্ধানে’ নামক একটি ফেসবুক পেজে সেই ভিডিওটি আপলোড হওয়ার পর তা নজরে আসে তুরস্কের নাগরিক আলতায় আককুছের। আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে সঁপে দেওয়া এই মানুষটি মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নেন ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করার। এরপর তিনি দেবীগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য ও টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়ন ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মোঃ শরীফ আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। শরীফের মাধ্যমেই অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর একটি তালিকা তৈরি করা হয় এবং সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
আজ সোমবার ৩০ মার্চ বিকেলে দেবীগঞ্জ পৌর শহরের বাজার সংলগ্ন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের পাশের খোলা মাঠে এক আবেগঘন পরিবেশে এই সহায়তা কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। টেপ্রীগঞ্জ ও সদর ইউনিয়নের মোট ২৪টি অতি দরিদ্র ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে ঘর মেরামতের জন্য ঢেউ টিন বিতরণ করা হয়। এ সময় টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়নের রামগঞ্জ বিলাসী ৫ নম্বর ওয়ার্ডের নবীনগর প্রধানপাড়া গ্রামের ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধ আব্দুল মজিদকে ২৬টি টিন এবং ৬৫ বছর বয়সী হালিমন বেগমকে ৬টি টিন প্রদান করা হয়। এছাড়া ক্ষতির তীব্রতা অনুযায়ী তালিকার অন্যান্য পরিবারগুলোকেও প্রয়োজনীয় সংখ্যক টিন তুলে দেওয়া হয়। আকস্মিক এই সহায়তায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন উপকারভোগীরা। দীর্ঘদিন ধরে কষ্টের মধ্যে থাকা এই মানুষগুলো টিন হাতে পেয়ে দুহাত তুলে দোয়া করেন এবং এমন মানবিক কাজ যেন অব্যাহত থাকে সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
বিতরণ অনুষ্ঠানে তুরস্কের নাগরিক আলতায় আককুছ এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা করেন। সরাসরি বাংলায় কথা বলতে না পারলেও প্রযুক্তির সহায়তা নেন তিনি। মোবাইলের ভয়েস ট্রান্সলেটরের মাধ্যমে উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই এলাকার মানুষের দুর্দশা দেখে আমি স্থির থাকতে পারিনি। আমি কোনো প্রতিদান চাই না, কেবল মহান আল্লাহকে খুশি করার উদ্দেশ্যেই এই কাজ করেছি। আমি চাই আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা দেখে এই অঞ্চলের সামর্থ্যবান ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও যেন অসহায় মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসেন। উল্লেখ্য, আলতায় আককুছ দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলে বসবাস করছেন এবং নিজ উদ্যোগে মসজিদ নির্মাণ, গোসলখানা তৈরি ও টিউবওয়েল স্থাপনের মতো অসংখ্য সেবামূলক কাজ করে যাচ্ছেন।
সহায়তা কার্যক্রমের সমন্বয়কারী ছাত্রদল নেতা শরীফ আহমেদ জানান, এলাকার মানুষ যখন বিপদে পড়ে, তখন ঘরে বসে থাকা সম্ভব হয় না। সাধ্যমতো সব সময় মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। তিনি আরও বলেন, আলতায় আককুছ একজন বিশাল হৃদয়ের মানুষ। তার এই মহানুভবতা দেবীগঞ্জের মানুষের মনে চিরকাল গেঁথে থাকবে। ভবিষ্যতেও এই ধরনের জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। মূলত একজন সচেতন নাগরিক ও ছাত্রনেতা হিসেবে শরীফের এই তৎপরতা এবং তুরস্কের নাগরিকের আর্থিক সহযোগিতা আজ ২৪টি পরিবারের ভিটেমাটিতে নতুন করে খুঁটি গাড়ার স্বপ্ন দেখাল।